ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে সিলেট: বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বড় দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে
স্টাফ রিপোর্টার | জনতা টিভি
সিলেট আবারও ভূমিকম্পের প্রবণতায় অস্থির। কখনো সীমান্তবর্তী ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্ট, আবার কখনো সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানীয় ফল্ট লাইন থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি—সব মিলিয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ভূকম্পন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা এসব স্থানীয় চ্যুতি লাইনের সক্রিয় হয়ে ওঠার ফলেই ক্রমশ বাড়ছে ভূমিকম্পের সংখ্যা এবং বাড়ছে বড় দুর্যোগের সম্ভাবনাও।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুভূত ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন—এই মাত্রার ভূমিকম্প সিলেটে সংঘটিত হলে নগরের বহু পুরনো ভবন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারত। কিন্তু এত বড় ঝুঁকির মধ্যেও সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) ভবন ঝুঁকি নিরূপণ কিংবা অপসারণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতাও এখনো খুব সীমিত।
ডাউকি ফল্ট: ইতিহাসের সাক্ষী ‘বড় ভুইছাল’
ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে সিলেটকে দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্ট এ ঝুঁকির অন্যতম কারণ।
১৮৯৭ সালের ১২ জুন ডাউকি ফল্ট থেকে উৎপন্ন ভয়াবহ ভূমিকম্পে বৃহত্তর সিলেটের বিশাল অংশ ধ্বংস হয়ে যায়—যা ইতিহাসে ‘বড় ভুইছাল’ নামে পরিচিত। এরপর বিভিন্ন সময়ে ওই ফল্ট থেকে ছোট-বড় ভূকম্পন অনুভূত হলেও বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কিন্তু ফল্টটি এখনো সক্রিয়, যা বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা।
২০২১ সালে ১০ দিনে ২০ বার ভূমিকম্প
২০২১ সালের মে মাসে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে সিলেটে ২০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়—যার মধ্যে বেশ কয়েকটির উৎপত্তি ডাউকি ফল্টের কাছে এবং বাকি ভূমিকম্পের উৎস ছিল সিলেট বিভাগ। এ ঘটনার পর সিসিক সব ভবনের ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘোষণা দিলেও বাজেট সংকট দেখিয়ে উদ্যোগটি থামিয়ে দেওয়া হয়।
সেই সময় চিহ্নিত ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আজও নামেনি; কিছু রঙ-তুলির কাজ আর সামান্য সংস্কারে সেগুলো যেভাবে-সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।
ঢাকার ৫.৭ মাত্রার ভূকম্পন: সিলেটের জন্য অশনি সংকেত
শুক্রবার ঢাকায় ৫.৭ মাত্রায় কেঁপে ওঠার পর সিলেটে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কম্পন যদি সিলেটে হতো, বহু পুরনো ও নন-ইঞ্জিনিয়ারিং বিল্ডিং মুহূর্তেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারত।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন—
‘মধুপুর ফল্ট লাইনে অনেকদিন কোনো নড়াচড়া ছিল না। এবার হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। সিলেটেও এমন অনেক নিষ্ক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে—যেগুলো গত কয়েক বছরে ছোট ছোট কম্পন দিচ্ছে। এখন সময় এসেছে এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার।’
তিনি আরও বলেন—
‘ঢাকায় নতুন বিল্ডিংগুলোতে ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে। কিন্তু সিলেটে একই মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরনো ভবনগুলো টিকবে না। এখনই ভবনগুলো পরীক্ষা করে সংস্কার না করলে বড় বিপদ এড়ানো কঠিন হবে।’
দুর্যোগ মোকাবেলায় সিলেট এখনো পিছিয়ে
ড. জহিরের মতে, আগের তুলনায় সিলেটের সক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও বড় দুর্যোগ মোকাবেলা করতে গেলে সেটি মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ।
তিনি বলেন—
‘সিলেটে ডিজাস্টার সেন্টার হয়েছে ঠিক, কিন্তু যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানো জরুরি। স্বেচ্ছাসেবী বাড়লেও বড় ভূমিকম্প সামাল দিতে এখনো যথেষ্ট নয়।’
তিনি আরও সতর্ক করেন—সিলেট নগরের উপশহর এলাকা জলাশয় ভরাট করে তৈরি হওয়ায় সেখানে হাইরাইজ ভবন বেশি, ফলে বড় ভূমিকম্প হলে এই এলাকায় ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ হতে পারে।
খোলা মাঠ নেই—দুর্যোগে বড় বাধা
নগরে খোলা মাঠ না থাকা সিলেটের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন,
‘দুর্যোগের সময় আশ্রয়ের জন্য খোলা মাঠ অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু সিলেটে সেগুলো প্রায় নেই বললেই চলে।’
⸻
সবশেষে, বিশেষজ্ঞদের একটাই আহ্বান—
সিলেট এখনই প্রস্তুতি না নিলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে।
জনতা টিভি নিউজ ডেস্ক




















